গাঁয়ের বধূ শহরে ছিনতাইকারী'

Total Views : 78
Zoom In Zoom Out Read Later Print

'গাঁয়ের বধূ শহরে ছিনতাইকারী', এক গ্রাম থেকেই এক হাজার নারী!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে নাসিরনগরের ধরমন্ডল গ্রাম। সড়ক পথে নাসিরনগর সদর হয়ে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হয় ওই গ্রামে। আলোচনা আছে, পুলিশও এখানে আসেন ভেবেচিন্তে। সংবাদকর্মী হিসেবেও সেই চিন্তাটা মাথায়। যে কারণে জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে আসার পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগিতা নেওয়া হয়।

ধরমন্ডল ইউনিয়ন যে পাঁচটি গ্রাম নিয়ে গঠিত এর একটি ধরমন্ডল গ্রাম। প্রায় ২০ হাজার লোকের বসবাস। এটি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রাম। ধর ও মন্ডল গ্রামে দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির নামের ওপর ভিত্তি করেই গ্রামটির নামকরণ করা হয় বলে আলোচনা আছে। আঁকাবাকা বলভদ্র নদী ওই গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে মেঘনায় মিশেছে।
  
দেশের কোথাও নারী ছিনতাইকারী ধরা পড়লেই উঠে আসে ধরমন্ডল গ্রামের নাম। ধরা পড়াদের ঠিকানা ধরমন্ডল। ওরা গ্রামটির গৃহবধূ। তবে শহরে গিয়ে ওদের পরিচিতি ছিনতাইকারী। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওই গ্রামের অন্তত এক শ নারী ছিনতাইকারী ধরা পড়ে।

এলাকায় গিয়ে ও বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রামটির প্রায় এক হাজার নারী ছিনতাইকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। একটি চক্র নারীদেরকে লাখ লাখ টাকায় চুক্তি করে ছিনতাইয়ের কাজে লাগায়। ছিনতাইয়ের প্রধান টার্গেট নারীদের শরীরে থাকা স্বর্ণালংকার। বিশেষ করে স্বর্নের চেইন। চুক্তি অনুযায়ি চক্রের হাতে এনে তারা এসব স্বর্ণালংকার তুলে দেয়। এ কাজে নানা কৌশলও কাজে লাগায় নারী ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে সঙ্গে শিশু রাখাটা হচ্ছে অন্যতম কৌশল। 

সরেজমিন
বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ধরমন্ডল যাওয়া। কথা হয় এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। বেরিয়ে আসে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনেকে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অনেকের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা চক্রটিকে মদদ দিয়ে থাকেন। চক্রের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি মদদদাতারাও এ কাজ থেকে আর্থিক লাভবান হন। দিনকে দিনে গ্রামটিতে নারী ছিনতাইকারীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। তবে তাদের কেউ নিজ গ্রামে অপরাধ ঘটান না।  

গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে মুর্তুজ আলীর বাড়ি। ২০১৯ সালের ৯ মে ফেনীতে ছিনতাইয়ের সময় ধরা পড়েন মুর্তুজ আলীর ছেলে রহিম মিয়ার স্ত্রী আকলিমা। বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, একপাশে একতলা টিপটপ দালান ঘর। আরেক পাশে টিনের ভাঙ্গা ঘর। টিনের ঘরটিতে মুর্তুজ আলী তার বড় ছেলেকে নিয়ে টিনের ঘরে থাকেন, যেটিতে এক সঙ্গে গরুরও বসবাস। 

পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশীরা জানালেন, আকলিমার বাড়ি হবিগঞ্জের মনতলা গ্রামে। বছর তিনেক ধরেই ওই নারীর চলাচলে পরিবর্তন আসে। বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বেশিরভাগ সময়ই এলাকার বাইরে থাকেন। নানান বিষয় নিয়ে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বনিবনা নেই। প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক অপেক্ষা করেও আকলিমার স্বামী রহিম মিয়ার দেখা মিলেনি। প্রথমে ঘরের বারান্দায় ভেতর থেকে তালা দেখা গেলেও পরে বাইরে থেকে তালা দেখা যায়।

গত বছর হবিগঞ্জের ঘাটিয়া এলাকায় ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আজকির মিয়ার স্ত্রী রাবেয়া জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তবে তাকেও বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। কথা হলে ভাই রশিদ জানান রাবেয়া অন্যত্র থাকেন। বাবার পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগও নেই বলে দাবি করেন তিনি।

গ্রামের সমস্যা, শিক্ষা ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিষয়ে খোঁজ নিতে এ প্রতিবেদক এসেছেন জানালেও আগে গ্রেপ্তারকৃতদের নাম ধরে খুঁজতে থাকার পরই জড়িতদের মধ্যে বাড়িতে থাকা অনেকে গা ঢাকা দেন। অনেকে আবার নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু করেন। তবে জামিনে ছাড়া পেয়ে গ্রেপ্তারকৃতরা আবারো একই কাজে নেমেছেন বলে স্থানীয়দের অনেকে জানান।

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়-সাত বছর আগে থেকেই এখানকার নারীরা ছিনতাইয়ের মতো পেশায় জাড়ায়। বছর তিনেক ধরে ছিনতাইকে পেশা হিসেবেই নিয়েছেন হাজার খানেক নারী। শুরুতে একজনের হাত ধরে আরেকজন এ পেশায় গেলেও এখন বেশিরভাগই চক্রের হাতে বন্দি। ওই চক্রটি একেকজন নারীর সঙ্গে সর্বনিম্ন এক বছরের জন্য চুক্তি। আর চুক্তি অনুযায়ী নারীদেরকে অগ্রীম টাকা দিয়ে দেয়া হয়। চুক্তিতে আবদ্ধ নারী নির্ধারিত বছরে যে পরিমাণ স্বর্ণালংকার ছিনতাই করতে পারবেন সেটা দিতে চুক্তিকারীকে দিয়ে দেবেন।

মূলত তারা দলবেঁধে এ কাজে নামেন। দেশের বিভিন্নস্থানে হোটেলে অবস্থান করে স্বর্ণের চেইন ছিনতাই করেন। তাদের প্রধান টার্গেট চলার পথের নারীরা। ছিনতাইয়ে ধরা পড়লে মানুষের সহানুভুতি পেতে কখনো কখনো তারা অন্যের সন্তানকেও ভাড়া করে নিয়ে আসেন।
ধরমন্ডল গ্রামের সড়ক বাজার সুপার মার্কেটের সামনে কথা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, ‘আমার এক নিকটাত্মীয় ছিনতাই পেশায় জড়িত। ওই নারী গত দুই-তিন বছর ধরেই বেশিরভাগ সময় এলাকার বাইরে থাকেন। একবার ধরা পড়লেও মাস খানেকের মধ্যে ছাড়া পেয়ে আবার এ পেশায় নামেন। আর্থিকভাবে উন্নতি হওয়ায় স্বামীকে এখন আর কিছু করতে হয় না।’ 

ওই যুবকের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর মদদ দেন। এক জনপ্রতিনিধির ভাই, সাবেক এক মেম্বার, একজন শীর্ষ জনপ্রতিনিধির আশেপাশে থাকা একাধিক ব্যক্তি মূলত তাদের পেছনের শক্তি হিসেবে কাজ করে। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে গ্রামে কথা বলার লোকও নেই। 

মোবাইল ফোন কথা হলে ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য (মেম্বার) জানান, তার ছেলে বৌও এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। অন্যান্য নারীদের সঙ্গে দলবেঁধে ঢাকায় গিয়ে ছিনতাই কাজ করত। গ্রামেরই আরেক নারীর মাধ্যমে সে এ কাজের জড়ায়। তবে তিনি মেম্বার হওয়ার পর অনেক বুঝিয়ে এ পেশা থেকে ফিরিয়ে এসেছেন।

আলোচনা করতে গিয়ে নাসিরনগরের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ধরমন্ডল গ্রামের শত শত নারী ছিনতাই পেশার সঙ্গে জড়িত। এখানকার অনেক পুরুষ চুরিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। গ্রামটিতে মামলা-মোকাদ্দমাও প্রচুর। বেশ কিছু খুন খারাবির ঘটনাও ঘটেছে বছর দশেকের মধ্যে। পুলিশ সেখানে গেলে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে যায়। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের সময় এক পুলিশ হামলার শিকার হয়। এছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও করেছে এ গ্রামের মানুষ।’  

See More

Latest Photos